লুঙ্গি নামা

"লুঙ্গি",  হ্যা আজকে কথা বলতে যাচ্ছি আমাদের বহুল প্রচলিত এবং ব্যবহৃত পোশাক লুঙ্গি নিয়ে।  জীবনে কোনোদিন লুঙ্গি পরেনি এমন লোক খুঁজেই পাওয়া দুষ্কর, আবার অনেকেই পরে কিন্তু লোকসমাজে স্বীকার করে না আর কিছু লোক পরতে পারে না বলে পরে না। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মায়ানমার ,  সোমালিয়া এবং  ইয়েমেন লুঙ্গি বহুল ব্যবহৃত। লুঙ্গি পুরুষরাই পরে কিন্তু ভারতের কেরালায় লুঙ্গি পুরুষ ও মহিলা উভয়েই পরে থাকেন।

 

লুঙ্গি আবিষ্কারের কাহিনী :

গবেষণায় দেখা গেছে, লুঙ্গি এর  সূচনা হয়েছে দক্ষিণ ভারতে বর্তমানে তামিলনাডুয়। "ভেস্তি" নামক এক ধরনের পোষাককে লুঙ্গির পূর্বসূরী বলে মনে করা হয়। ইতিহাসে উল্লেখিত আছে মসলিন কাপড়ের ভেস্তি পোষাক তামিল থেকে ব্যবিলনে রপ্তানী হত। ব্যবিলনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিবন্ধে 'সিন্ধু' শব্দ খুঁজে পাওয়া যায়। তামিল ভাষায় সিন্ধু অর্থ কাপড় বা পোষাক। 'বারাদাভারগাল' নামের তামিলনাডুর জেলে সম্প্রদায় পশ্চিম আফ্রিকা, ইজিপ্ট বা মিশর এবং মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে লুঙ্গি রপ্তানীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সময়ের সাথে, সাদা কাপড়ে ফুল এবং অন্যান্য নকশা চিত্রিত হয়ে পরবর্তীতে লুঙ্গিতে পরিণত হয়েছে।

জুতা আবিষ্কারের মতো লুঙ্গি আবিষ্কার নিয়েও একটা গল্প প্রচলিত আছে, এক রাজা গেছেন প্রজাদের সভায়। পরনে ছিল পাজামা। সভার মাঝখানে পেট মোচড় দিয়ে উঠলে গেলেন টয়লেটে। কিন্তু, পাজামার কোমরের বন্ধনী তাড়াতাড়ি খুলতে না পারায় ঘটে গেলো বিপত্তি। পাজামার পেছনটা ভিজে হয়ে গেলো হলুদ। এতে রাজা ক্ষেপে আগুন। তাৎক্ষণিক রাজ্যের প্রধান উজিরকে ডেকে পাজামার বন্ধনী সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার কঠোর নির্দেশ দিলেন। যেহেতু পাজামার গিট্ এতো বড়ো দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, রাজার ইচ্ছে, বাকি জীবনে তিনি আর পাজামা পড়বেন না। রাজার নির্দেশ বলে কথা! যেই কথা সেই কাজ। প্রধান উজির তাৎক্ষণিক রাজ্যের সব বিশেষজ্ঞ এক করে পাজামার এক বিকল্প খুঁজে বের করলেন। সেই বিকল্পের আধুনিক নাম ‘লুঙ্গি’, যাতে কোনো বন্ধনী বা রশি নেই।

 

সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ :  

নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেন, আদিম মানুষ নগ্ন অবস্থায় থাকত। পরে এখন থেকে প্রায় ৭২ হাজার বছর আগে মানুষ নগ্নতা ঢাকতে পোশাকের ব্যবহার শুরু করে, সুতরাং আমরা বলতে পারি সেসময় থেকেই পোশাকের ঢঙ্ শুরু।

পোশাক মানুষের ব্যক্তিত্বের যেমন পরিচয় তুলে ধরে একই সঙ্গে পোশাক সেই দেশ, সংস্কৃতি ও সময়কেও ধারণ করে। প্রাচীন সভ্যতার পরিচয় আমরা পাই টেরাকোটায় সে সময়ের মানুষের মূর্তি ও ছবি দেখে। পোশাক তাই ব্যক্তি মানুষের রুচি, পছন্দ প্রকাশের পাশাপাশি  সময় ও সংস্কৃতিকেও সংরক্ষণ ও প্রতিনিধিত্ব করে চলে। আর পোশাকের বিবর্তন যা-ই ঘটুক না কেন তা আসে ঐতিহ্যের পথ ধরেই। তবে বর্তমান বিশ্ব পশ্চিমা ফ্যাশনের প্রভাবে আলোড়িত। মানুষের পছন্দের কাছে দেশীয় পোশাকের চাহিদা কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। পশ্চিমা রীতির পোশাকের ব্যবহার আমাদের মাঝে বেশি। এটাই সাংস্কিতিক আধিপত্ত্ব। যদি ভারত মহাদেশ পৃথিবী শাসন করতো তাহলে সারা পৃথিবীর মানুষ হয়তোবা লুঙ্গি পরতো। তারপরও পহেলা বৈশাখ এলে একদিনের জন্য হলেও দেশীয় পোশাকে পুরো বাংলাদেশ সেজে ওঠে। একদিনের জন্য হলেও বাঙালি হয়ে উঠবার একটা চেষ্টা থাকে।

 

লুঙ্গি ফ্যাশন :  

ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় তার ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব’ গ্রন্থে বলেছেন, প্রাচীনকালে পূর্ব-দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে সেলাই করা কাপড় পরার চল ছিল না। অখণ্ড বস্ত্রটি পুরুষ পরলে হতো ধুতি, আর মেয়েরা পরলে শাড়ি। আর্য যুগে পুরো ভারতে গাছের বাকল থেকে তৈরি করা কাপড় ব্যবহারের প্রচলন ছিল। এই বঙ্গদেশে এক সময় কাপড় তৈরি হতো গাছের বাকল থেকে। গাছের বাকলকে কাপড়ের মতো পাতলা করে ব্যবহার করত। বাকল থেকে তৈরি কাপড়কে বলা হতো ‘ক্ষৌম’। নওগাঁর পাহাড়পুরের টেরাকোটায় চতুর্থ শতাব্দীর পোশাকের চিত্র পাওয়া  গেছে। এতে দেখা যায়, পুরুষদের শুধু শরীরে নিচের অংশে পোশাকের ব্যবহার আর নারীদের নিচে ও বক্ষবন্ধনীর ব্যবহার। প্রথমে বাকল, পরে সুতিবস্ত্রের প্রচলন শুরু হয় বঙ্গে। শন, পাট থেকে সুতা তৈরির প্রচলনও ছিল। এছাড়া খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ থেকে ৪০০ অব্দের দিকে বঙ্গ এবং মগধে রেশমের চাষ হতো।

ইতিহাসের আলোচনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, বাঙালির লুঙ্গি পরার বয়স একশ’ বছরের সামান্য বেশি। কিন্তু এই একশ বছরে লুঙ্গির ডিজাইনে, পরার ধরনে, বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তেমন একটা পরিবর্তন আসেনি। সেই চেক লুঙ্গি, তাতে রঙের প্রাধান্য দেখে আসছি। একরঙা লুঙ্গিও কিছু আছে অবশ্য। আর আছে বাটিকের লুঙ্গি। কিন্তু সেটাও বেশি দিন হলো যোগ হয়নি। ইদানিং গ্যাস ফেব্রিক আর সিল্কের লুঙ্গিও বানানো হচ্ছে। তবে এসব কিছু লুঙ্গির নতুন জীবন পানি  দিতে পারেনি।

"আমরা পোশাক কিনিনা, কিনি একটা স্বপ্ন!" আমরা পোশাক কেনার সময় এটা ভেবে কিনি যে এই পোশাকটা পরে আমাকে ঐরকম দেখাতে হবে।  নতুন বা ভিন্ন কিছু করা বা পরার চাহিদাই ফ্যাশন এর জ্বালানি।  আমরা যদি এভাবে চিন্তা করি আমাকে নতুন ভিন্ন  কিছু পরতে, আমাকে চিন্তা ও মননে ভিন্ন দেখাতে হবে, আমি যেটা করবো এটাই নতুন ফ্যাশন,  সংকীর্ণতা ও  হীনমন্যতার  উর্ধে গিয়ে  আমরা লুঙ্গি কিন্তু পরতেই পারি এবং এটাই হতে পারে নতুন ফ্যাশন এবং বিশ্ব দরবারে লুঙ্গিকে  প্রতিষ্ঠিত করতে  পরে আরামদায়ক একটা পোশাক হিসেবে। অফিস আদালত এ না পরি, দেশীয় ঐতিহ্যগত অনুষ্ঠান, জাতীয় অনুষ্ঠান, বন্ধুদের আড্ডায়, পারিবারিক অনুষ্ঠানে পরতে পারি আর বাসায় তো পড়তেই পারি। 

 

স্বাস্থগত দিক বিবেচনায় লুঙ্গি:

লুঙ্গির স্বাস্থগতও অনেক দিক  আছে যা বিবেচনায় আমরা লুঙ্গিকে সবচাইতে স্বাস্থসম্মত ও আরামদায়ক পোশাক বলতে পারি ( যদি আমরা লুঙ্গির মাধ্যমে ইজ্জত হননের কথাটা বাদ দেই কারণ লুঙ্গি নিয়ে তীক্ত অভিজ্ঞতা নেই এমন একজনও পাওয়া  যাবে না)। আমাদের মতো অধিক আর্দ্রতাপূর্ণ আবহাওয়ার দেশের জন্য লুঙ্গি খুবই আরামদায়ক ও স্বাস্থসম্মত একটি পোশাক। লুঙ্গি পরলে ঘাম কম হয় এবং শুকিয়ে যায়ও তাড়াতড়ি যা রোগ জীবাণুমুক্ত ও স্বাস্থবান থাকতে সহায়তা করে। প্যান্ট বা ট্রাউসার পরার কারণে অধিক গরম আর ঘাম থেকে যে ব্যক্টেরিয়া তৈরী হয় তা থেকে নানান ধরণের চর্মরোগ হতে পারে যার ঝুঁকি আমরা লুঙ্গি পরার মাধ্যমে কমাতে পারি। আর লুঙ্গি ব্যবস্থাপনা খুব সহজ, যেমন ধুতে সহজ, শুকায় তাড়াতাড়ি, ইস্ত্রি করার প্রয়োজনীয়তা খুবই কম।

 

সর্বোপরি লুঙ্গিকে আমরা একটি স্বাস্থসহায়ক পোশাক বলতে পারি। এটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। আমরা যদি শুধু আমাদের হীনমন্যতা দূর করে নিজের সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং বিশ্ব সংস্কৃতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরী ও নিজস্বতা তুলে  ধরার নিমিত্তে আমাদের নিজস্ব পোষাক পরতে থাকি একদিন বিশ্বশাকস্কৃতিক অঙ্গনে আমাদেরও একটা স্বকীয়তা আর পরিচিতি তৈরী হবে।  আর বাসায় পরার জন্য শুধু স্বাস্থগত দিক বিবেচনাই যথেষ্ট।