বাংলাদেশে ই-কমার্স ব্যবসা ও তার পরিবেশ

জীবন ব্যবস্থাকে সহজ করার জন্য আমাদের চেষ্টার শেষ নেই। তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা তা করতেও সফল হয়েছি। নিমিষেই আমরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যোগাযোগ করতে পারি যেখানে আগে একটা চিঠি পাঠিয়ে তার উত্তর পেতে লেগে যেত দীর্ঘ দিন। এখন বাসা থেকে নামতে নামতে বাসার নিচে ভাড়ার গাড়ি নিয়ে আসতে পারি, গুগল স্ট্রিট ভিউ এর মাধ্যমে অচেনা জায়গা সম্পর্কে সম্মক জ্ঞান নিতে পারি না যেয়েই। ঘরে বসে পৃথিবীর ওপর প্রান্তের যেকোনো পছন্দের জিনিস কিনতে পারি।

 

ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং ইন্টারনেট এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করাকে ই-কমার্স বলে।প্রথম ই-কমার্স শুরু করেন মাইকেল এলড্রিচ ইংল্যান্ডে ১৯৭৯ সালে টেলিভিশন এবং টেলিফোন সংযোগ এর মাধ্যমে। প্রথম ই-কমার্স কোম্পানি "বোস্টন কম্পিউটার এক্সচেঞ্জ", তারা ই-কমার্স এর মাধমে ব্যবহৃত কম্পিউটার কেনা বেচা শুরু করে। বর্তমান বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ ই-কমার্স কোম্পানি হলো আমাজন, জিংডং, আলিবাবা, ইবে, রাকুতেন, বিটুডব্লিউ, জালান্দো, ফ্লিপকার্ট ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ ই-কমার্স কোম্পানি দারাজ, প্রিয়শপ, রকমারি, পিকাবো, বাগডুম, আজকেরডিল, অথবা, ক্লিকবিডি ইত্যাদি।

 

প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার সম্প্রসারণের ফলে ই-কমার্সে ক্রেতা ও বিক্রেতার শক্তি বেড়েছে এবং বাজার প্রসারিত হচ্ছে, এখন ব্যবসার বড় একটা অংশ পরিচালিত হচ্ছে ই-কমার্সের মাধ্যমে। বাংলাদেশে ই-কমার্স ব্যবসার লক্ষণীয় পরিবর্তন আসে ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালে ৭০% বৃদ্ধি পেয়ে বিটুসি এর বাজার দাঁড়ায় ৯০০ কোটি টাকার যেখানে মোট খুচরা ব্যবসার বাজার মোট মূল্য ছিল ১,৩৩,৫৭১ কোটি টাকা, যেখানে ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালে ভারতের ই-কমার্স বাজার মূল্য ৪ বিলিয়ন টাকার থেকে হয় ১৭ বিলিয়ন টাকা। ২০২১ সালে বাংলাদেশের বাজার হতে পারে ৭০০ হাজার টাকার। ২০১৯ সালে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে রিটেল ই-কমার্স ব্যবসার প্রসারণ হার ছিল ২৫% এবং বিশ্বব্যাপী ২০.৭% যার বাজার মূল্য ৩.৫৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০২১ সালে প্রসারণ ধরা হয়েছে ১৭.১% যার বাজার মূল্য হতে পারে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার।

 

২০১৮ এর তথ্য অনুযায়ীই বাংলাদেশে প্রতিমাসে ই-কমার্স ব্যবসার প্রসারণ হয় ৭২%, এবং ৩৫,০০০ বেক্তি এবং ২৫,০০০ ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা ই-কমার্স ব্যবসার সাথে জড়িত। ২,৫০০ ই-কমার্স ওয়েবসাইট এবং ১৫০,০০০ পেজ এর মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিদিন প্রায় ১৫-২০ হাজার খুচরা ডেলিভারি হয়।

 

২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ৯৯% লোক মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, ৪১% লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে, ৩ কোটি ৬০ লাখ লোক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যববার করে, সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ ই-কমার্সের জন্য খুবই সম্ভাবনাময় ক্রমবর্ধমান বাজার। এর সাথে কিছু ব্যবসায়িক অন্তরায়ও রয়েছে যেমন স্বতন্ত্র চিন্তার অভাব, মানসম্মত ডেভেলপারের অভাব, অভিজ্ঞ ডিজিটাল মার্কেটারের অভাব, অপ্রতুল সরবরাহ ব্যবস্থা কিন্তু আমি যেটা মনে করি বাংদেশে ই-কমার্স ব্যবসার প্রধান অন্তরায় আমাদের নৈতিকতা এবং অপেশাদারীত্ব। আমাদের দেশে অনলাইনে মোবাইল ফোন কিনতে আলু পাঠানো হয়, এক রং বা সাইজ এর পণ্য অর্ডার করা হলে অন্যটা পাঠানো হয়, গুগল অথবা পিন্টারেস্ট থেকে ছবি ডাউন করে সেই ছবি দেখিয়ে নিজের পণ্য বিক্রি করা হয় এতে করে ক্রেতার আশাভঙ্গ হচ্ছে। অগ্রিম নিয়ে পণ্য সরবরাহ করা হয় না যেক্ষেত্রে ক্রেতাদের এখন অগ্রম প্রদানে অনীহা দেখা দিয়েছে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক ব্যবস্থাই ই-কমার্স, এর পরিবেশ ঠিক না রাখতে পারলে ক্রেতারা আস্থা হারাবে ই-কমার্সের উপর।

 

এই সমস্যা সমাধানে অনেক কিছুই করার আছে, ব্যবসায়ী হিসেবে সততা ধরে রাখতে হবে। পণ্য যদি ভালো ও ন্যায্য মূল্যের হয় আপনি ক্রেতা পাবেনই। ব্যবসায় সাফল্য লাভের কোনো শর্টকার্ট নাই চুরি ছাড়া যেটা পুরা ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিকে ধ্বংস করে দিবে যেমন শুরু না হতেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো কল সেন্টার ব্যবসার অনন্য সুযোগ। ক্রেতাদেরও অনেক বেশি সতর্ক এবং বিশ্লেষণী হতে হবে যাতে আপনার অসতর্কতা ও বোকামি কোনো অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য সুযোগ তৈরী করে না দেয়।

 

ই-কমার্স এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ এক্ষেত্রে সবচাইতে জোরালো এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ই-কমার্স ব্যবসার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে। নতুন উদ্যোক্তা ও সুযোগ তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবসার টেকসই পরিবেশ তৈরী করতে হবে। ই-কমার্স সাইট গুলার ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, ভেরিফাইড সাইট এর ক্রেতা-বিক্রেতার দাবি ই-কমার্স এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ সমাধান করবে এতে করে ক্রেতা-বিক্রেতার আস্থা বাড়বে। অসৎ ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সাময়িক ও স্থায়ী ভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে।

 

শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ই-কমার্স ব্যবসার জন্য যুগপোযোগী আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করে ব্যবসার সুষ্ঠু ও মসৃণ পরিবেশ করে ই-কমার্স ব্যবসার গতি তথা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তরান্নিত করতে পারেন। এতে করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে উৎসাহী হবে।

 

সর্বোপরি আমাদের ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের প্রতি নজর দিতে হবে। ই-কমার্সে একজন ক্রেতা না দেখে পণ্য ক্রয় আর তার সেই আস্থার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা কি সেই পরিবেশ এখনো তৈরী করতে পেরেছি?

 

 

তথ্য উৎস: ihsmarkit.com, emarketer.com, shopify.com, brainstorming-23.com, dataportal.com